অধ্যাপক ডা. জেহাদ খানের জীবনের গল্প

অধ্যাপক ডা. কর্নেল (অব.) জেহাদ খান। ১৯৫৭ সালে ১১ মার্চ কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জাফরাবাদ ইউনিয়নে একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার পৈত্রিক বাড়ি ক্বারী সাহেব বাড়ি নামে সুপরিচিত ছিল।

জেহাদ খানের নানা যুক্তফ্রন্টের এমলএ বা এমপি ছিলেন। ১৯২৩ সালে তিনি বিএ পাশ করেন তিনি। আকর্ষনীয় সরকারি চাকরিতে যোগদান না করে কিশোরগঞ্জ আজিম উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন।
কিশোরগঞ্জের শহীদি মসজিদ, জামিয়া ইমদাদিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন তিনি।

জেহাদ খানের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রাতিষ্ঠান আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়ায়। সেখানে তিনি ৫ বছর পড়াশুনা করার পর আজিম উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ওই বছরই তিনি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। ৮ম শ্রেণিতেও তিনি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান।

জেহাদ খান ১৯৭৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে ২১তম স্থান অধিকার করেন। এসএসসি পরীক্ষায় পুরো কিশোরগঞ্জ জেলায় ১ম হওয়ায় ‘ রায়মহাশয়” স্বর্ণপদক লাভ করেন।
১৯৭৮ সালে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ থেকে স্টার মার্ক পেয়ে এইসএসসি পাশ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। কিছুদিন পর তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার সরকারি বৃত্তি নিয়ে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নের জন্য তিনি রাশিয়া গমন করেন।

দীর্ঘ সাত বছর ডাক্তারি বিদ্যার পাশ করার পাশাপাশি সৌদি সহপাঠীদের সান্নিধ্যে থেকে ইসলামের নানা বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন।
১৯৮৬ সালে তাজিকিস্তান থেকে কৃতিত্বের সাথে ডাক্তারি পাশ করেন ।
১৯৮৮ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মেডিকেল কোরে যোগদান করেন।
১৯৯৮ সালে তিনি এসসিপিএস পাশ করে ঢাকা সিএমএইচে কার্ঢিওলজি বিভাগে যোগদান করেন।
২০০০ সালে উচ্চতর প্রশিক্ষনের জন্য জার্মান সরকারের বৃত্তি নিয়ে জার্মানী গমন করেন।
২০০০-২০০৬ তিনি আফ্রিকার আইভরিকোস্টে জাতিসংঘ বাহিনীতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব পালন করেন।
পার্বত্য চট্রগ্রামে তিনি সামরিক ও বেসামরিক নাগরিকদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন তিনি।

দীর্ঘ ২৬ বছর সারাদেশে বিভিন্ন সামরীক হাসপাতালে অত্যন্ত দক্ষতা ও সততার সাথে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন।তাছাড়া তিনি কয়েক বছর ঢাকা আর্মডফোর্সেস মেডিকেল কলেজে অধ্যাপনা করেন ।

২০১৪ সালে তিনি স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরগ্রহণের পর তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে পুরোপুরি নিজেকে নিয়োজিত করেন।

২০১৬ সালে ইবনে সিনা কার্ডিয়াক সেন্টার (ধানমন্ডি,ঢাকা) যোগদানের পর থেকে অদ্যাবধি শত শত হৃদরোগীকে স্বল্প মূল্যে চিকিৎসা দিয়ে চলেছেন।

কোভিডের সময় তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করে জীবনে ঝুঁকি নিয়ে কোভিড রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছেন। করোনা আক্রান্তদের সেবা করতে গিয়ে ওই সময় তিনি নিজেও দুইবার করোনা আক্রান্ত হয়ে আইসিউতে ভর্তি ছিলেন। তারপরও তিনি দমে যাননি, সুস্থ হয়ে আবারও তিনি রোগীদের সেবায় নিয়োজিত হন।
জেহাদ খান সবচেয়ে সাহসী ভূমিকা পালন করেন জুলাই বিপ্লবের সময়। শেখ হাসিনা সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি জুলাই আন্দোলনে আহত ছাত্রদেরকে নিজ হাতে চিকিৎসা দেন। তিনি আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি নানাভাবে সহায়তাও করেন।

গুলিবিদ্ধ আহত রোগীরা যখন ঢাকা মেডিকেলে ঔষদের অভাবে কাতরাচ্ছিলেন তখন তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কারফিউয়ের মধ্যেই রোগিদের ঔষদ সরবরাহের ব্যবস্থা করেন।

সততা ও দক্ষতার কারণে সেনাবাহিনীতেও ডা. জেহাদ খানের ব্যাপক জনপ্রিয়। সম্প্রতি তিনি অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তাদের সংগঠন রিটায়ার্ড আর্ম ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার এ্যসোসিয়েশন (RAOWA) এর কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ।

দীর্ঘ দিন ধরে তিনি তার এলকায় অনেকবার মেডিকেল ক্যাম্প করেছন, ইবনে সিনা মেডিকেল কল্যাণপুর, ঢাকা , ও রাষ্ট্রপতি আ: হামিদ মেডিকেল কলেজ , কিশোরগঞ্জের অবৈতনিক প্রফেসরের দায়িত্ব পালন করছেন । বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রপতি আ: হামিদ মেডিকেল কলেজ,জাফ্রাবাদ ,কিশোরগঞ্জের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত।

তিনি ইবনে সিনা ট্রাষ্টের বোর্ড মেম্বার এবং ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের ডাইরেক্টর । তিনি মানারাত ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। এছাড়াও তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা,টঙ্গী , তামিরুল মিল্লাত মহিলা কামিল মাদ্রাসা,ডেমরা। ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ কল্যানপুর । রাষ্ট্রপতি আ: হামিদ মেডিকেল কলেজ,জাফ্রাবাদ ,কিশোরগঞ্জ,মানারাত ইন্টার ন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ এর গভর্নিং বডির মেম্বার।

তিনি জেনেসিস মেডিকেল কোচিং সেন্টারের এবং “প্রাক”: নামক একটি এনজিওর চেয়ারম্যান। তুরস্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা হাসানের সমন্বয়কারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি মিয়ানমারের নির্যাতিত আরাকান মুসলিমদের ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তায় অংশগ্রহন করেছেন।

ডা. জেহাদ খান পৃথিবীর ২৫টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন বিভিন্ন সিম্পোজিয়াম ও সেমিনারে অংশগ্রহন করেছেন । শত ব্যস্ততা সত্তেও তিনি পত্রিকা ও বিভিন্ন জার্নালে নিয়মিত বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে লিখে থকেন। তার লেখা বই ‘জিনের আসর , ধর্ম ও বিজ্ঞানের আলোকে মাদকাসক্তি ও প্রতিকার বই দুটি এবং ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ইসলাম” সম্প্রতি পাঠকদের মনে বেশ পাঠকপ্রিয়তা তৈরি করেছে।

বাল্যকালে তিনি বেশ অভাবের মধ্যে বড় হয়েছেন যা বলতে তিনি কখনো দ্বিধাকরেন না।

অভাবের কারণে তিনি সময় মত স্কুল ও মদ্রাসার যেতে পারেননি। তাই আটবছর বয়সে তিনি অবৈতনিক মাদ্রাসায় ১ম শ্রেণী ভর্তি হন। তার বাবা ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও সহজ-সরল মানুষ। তাঁর দোয়তে সম্ভবতঃ তাঁর ৬ ছেলে-মেয়ে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। বড় মেয়ের স্বামী হচ্ছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এ্যডভোকেট। নিকআত্মীয় রাষ্টপতি হওয়া স্বত্বেও তিনি সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা গ্রহন করেননি এবং আত্মীয়তার কারণে তাকে বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। তার বড় ভাই প্রফেসর, নৌশদ খান যিনি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার আলো জালিয়েছেন ।এলাকায় তিনি এবং তা স্ত্রী স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ অসংখ মানুষকে
সারাজীবন সা্বল্প মূল্যে বা বিনা মূলে চিকিৎস সেবা প্রদান করেছেন। ডা: জেহাদ খান ১৯৮৮ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্ত্রী এবং ছেলেও চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ।

ডা. জেহাদ খানও দীর্ঘ দিন ঢাকায় অত্যন্ত ব্যস্ততম সময় অতিবাহিত করছেন। এবার তার ইচ্ছা ভিন্ন রকম। তিনি মাটির ঋন শোধ করতে চান। তার ইচ্ছা বকি জীবন অন্যান্য ব্যস্ততা কমিয়ে তিনি এলাকায় আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাবেন। ইতিমধ্যে এলাশায় তার সরব উপস্থিতি অনুভব করা যাচ্ছে। আপাতত- সপ্তাহে দুই দিন এলাকায় রোগী দেখছেন। গন- সংযোগ করছেন। তার পরিবারের প্রতি আস্থা থাকার কারণে মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে এবার তার দেবার পালা। তার, উদ্যোগে কিশোরগঞ্জের স্ট্যাশনরোডের সবচেয়ে উচু ভবনে ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিস্ঠার কার্যক্রম ইতিমধে্য শুরু হয়েছে। এলাকার চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নয়নে তিনি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছেন।

তিনি মহাগ্রন্ত আল-কোরআন আলোকে শক্ত ভাবে ধারণ করার চেষ্টায় নিয়োজিত। শুধু তেলাওয়াতের মধ্যে নয় বরং মহাগ্রন্তে আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি জীবন বিধানকে বস্তবায়ন করা তার লক্ষ্য । সমাজ পরিবর্তনে রাসুল (সা:) এর সংগ্রামী জীবন হচ্ছে তার আদর্শ” তাই দুনিয়ার সম্পদের ,লোভ-লালসা তাকে আর্কষন করতে পারেনি। তার বাবার সহজ-সরল জীবনই তার পছন্দ। প্রথিতযশা ডাক্তার হয়েও তেমন সম্পদ নেই।

নিজের ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. জেহাদ খান বলেন, কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এলাকার মানুষের কাজ করে এর বিনিময় পরকালে মহান আল্লাহর কাছে থেকেই পেতে চান। করিমগঞ্জ ও তাড়াইলবাসীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করতে চাই। এই দুই উপজেলার কোনো মানুষ যাতে চিকিৎসার অভাবে মারা না যায় সেজন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সবই করতে চাই।

জামায়াতের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে তিনি এলাকায় ব্যাপক সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন। প্রতি সপ্তাহেই তিনি করিমগঞ্জ ও তাড়াইলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করছেন। এতে গ্রামের অসহায় দরিদ্র অনেক মানুষ বিশেষ উপকৃত হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. জেহাদ খান বলেন, আমাকে জামায়াত গ্রামের মানুষের সেবা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। এজন্য আমি প্রতিদিনই স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছি। এমনকি ঈদের দিনও আমি হাসপাতালগুলোতে গিয়ে রোগীদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি, তাদের উপহার দিয়েছি। এলাকার মানুষের ভালোবাসায় আমি অভিভূত। আমি মানুষের সেবা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাই।

SHARE